
মেঘভাঙা বৃষ্টির শব্দটা সাধারণ বৃষ্টির মতো ছিল না। মনে হচ্ছিল, আকাশের বুক চিরে হাজার হাজার টন পাথর আছড়ে পড়ছে হিমালয়ের পাহাড়ি জনপদে।
রাত তিনটের দিকে রাম বাহাদুরের ঘুম ভাঙল ঘরের মেঝেতে পানির অদ্ভুত কুলকুল শব্দে। বিছানা থেকে পা ফেলতেই দেখলেন গোড়ালি পর্যন্ত ঘোলা পানি। বাইরে পরিস্থিতি দেখতে যেই দরজাটা খুললেন, বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল তাঁর। বাইরের পৃথিবীটা যেন আর চেনা নেই! আশেপাশের টিনের চালের বাড়িগুলো খড়কুটোর মতো ভেঙে ভেঙে পানির তোড়ে তলিয়ে যাচ্ছে। ওপাশে প্রতিবেশীর কাঠের দোকানটা এক লহমায় উপড়ে নিয়ে গেল কালো পানির এক দানবীয় স্রোত।
“ওপরে চলো! সবাই ছাদে ওঠো!” — রাম বাহাদুর চিৎকার করে উঠলেন।
স্ত্রী, দুই সন্তান আর বয়োবৃদ্ধা মাকে নিয়ে তিনি হালকা সবুজ রঙের দোতলা বাড়িটির ছাদে গিয়ে দাঁড়ালেন। চারদিকে তখন শুধু এক গর্জন—পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা, পাথর আর উপড়ে যাওয়া গাছের এক প্রলয়ঙ্করী স্রোত।
চোখের সামনে একে একে ভেসে গেল গ্রামের সব কটি ঘর। পানির দানবীয় তোড় এসে আছড়ে পড়তে লাগল তাঁদের বাড়ির দেওয়ালে। প্রতিটি ধাক্কায় রাম বাহাদুর চোখ বন্ধ করছিলেন—এই বুঝি পায়ের তলার কংক্রিট ভেঙে অতলে হারিয়ে গেল! স্ত্রী সন্তানদের বুকে জড়িয়ে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছিলেন।
কিন্তু অদ্ভুত এক বিস্ময়—প্রবল স্রোত বাড়ির দুই কোণায় ধাক্কা খেয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পাশ দিয়ে বয়ে যেতে লাগল। দেওয়াল কাঁপছে, কিন্তু ভিত নড়ছে না। বাড়িটি যেন কোনো অদৃশ্য শেকড় দিয়ে মাটির অতলকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরে আছে।
ভোর হলো। পুরো এলাকাটা তখন এক ধূসর, কর্দমাক্ত হ্রদ। শত শত ঘরবাড়ির কোনো চিহ্ন নেই, শুধু সেই ধ্বংসস্তূপের বুক চিরে একাকী দাঁড়িয়ে আছে হালকা সবুজ রঙের দোতলা বাড়িটি। ছাদের এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে একটি পরিবার।
যখন লাল রঙের উদ্ধারকারী বোটটি এসে বাড়ির রেলিং স্পর্শ করল, রাম বাহাদুর কোনো কথা বলতে পারলেন না। শুধু হাত দিয়ে শক্ত দেওয়ালটা একবার ছুঁয়ে দেখলেন—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোনো কোনো দেওয়াল জীবনকে পরম বিশ্বস্ততায় ধরে রাখতে জানে।









